
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে দরিদ্র জেলে বা মৎস্যজীবীদের মাঝে বকনা বাছুর বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার (১৪.০৫.২৫) দুপুরে উপজেলা মৎস্য অফিস উপজেলার স্বীকৃত (কার্ডধারী) ৭৫ জন মৎস্যজীবির মধ্যে ৭৫টি বকনা বাছুর বিতরণ করে। বিতরণ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভীর হাসান চৌধুরী। মৎস্য কর্মকর্তার কাছে সুবিধাপ্রাপ্তদের নামের তালিকা চেয়েও পাওয়া যায়নি।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অসহায় জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিতে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক গৃহীত “দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ- উন্নয়ন প্রকল্পের”আওতায় মৎস্যজীবিদের মাঝে এই গবাদিপশু বিতরণ করা হয়। গত বুধবার বাছুর বিতরণের পরে বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিতরনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুকে এখনো সমালোচনা চলছে।
এ বিষয়ে নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। তালিকা করার বিষয়ে জানেননা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। তাঁদের কাউকে অতিথিও করা হয়নি। এসব নিয়ে বাছুর বিতরণকালে হট্ট্রগোল হয়। যে কারণে বিতরণেও সমস্যা হয়। একজনের গরু অন্যজন নিয়ে চলে যায়।
সাতৈর ইউনিয়নের ‘মজুরদিয়া ঘাটের মৎস্যজীবি সমিতির’ সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, তাঁর সমিতির ২০ জনের নাম ছিল তালিকায় কিন্তু পেয়েছে ৯জন। বাকি ১১জন বাছুর পায়নি। এমনকি তার নিজেরটাও পাননি। পরে তারটা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তা। নাজিম উদ্দিন আরও বলেন, ব্যাপক হট্ট্রেগোল দেখে তিনি উপজেলা থেকে চলে যান। আবার এই নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে বাছুর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রবীন্দ্র মালোর স্ত্রী অঞ্জনা মালো অভিযোগ করেছেন, তার নিকট থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছেন নাজিম উদ্দিন। বিকাশ মালো টাকা দিতে না পারায় তালিকায় তার নাম দেওয়া হয়নি। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে নাজিম উদ্দিন বলেন চুক্তিপত্রের স্টাম্পের জন্য ৫০০ টাকা আর যে কয়দিন বোয়ালমারী গিয়েছি সেই কয়দিনের গাড়ি ভাড়া নিয়েছি। বরাদ্দকৃত বাছুর না পাওয়ায় রাগ করে সাংবাদিকদের নিকট আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছে। আর বিকাশ মালো আমার সমিতির সদস্যই না। অপরদিকে ময়না ইউনিয়নের বান্দুকগ্রামের নীলকন্ঠ মালোর ছেলে নির্মল মালোর বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে বাছুর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আনন্দ মালো, উপেন মালো বলেছেন তারা নির্মল মালোকে ১৫ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। এলাকার আরও অনেকে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। উপেন মালো বলেন, টাকা নেওয়া স্বত্বেও আমাকে বাছুর না দিয়ে কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়পপাড়া এলাকার চায়না নামের এক মহিলার নিকট থেকে ১৬ হাজার টাকা নিয়ে বাছুর দিয়েছে। মলিনা রাণী নামে আরেকজন জানান কার্ডধারী না হয়েও নির্মল মালোকে ৩২ হাজার টাকা দিয়ে ২টা বাছুর নিয়েছে। নির্মল মালো ফোন (০১৭২১৬৫০৯৫২) না ধরায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে বকনা বাছুর বিতরণ কর্মসূচিকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দূর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এর কঠোর সমালোচনা করেছেন স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।
বোয়ালমারী পৌর জামাতের আমীর মাওলানা সৈয়দ নিয়ামুল হাসান জানান, গবাদি পশু বিতরনের মত এত বড় একটা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলো অথচ আমরা কিছুই জানিনা। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় না করে অতি গোপনে তালিকা করে নিজের পছন্দের লোকদেরকে গরু দিয়েছেন।
উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সঞ্জয় কুমার সাহা ও উপজেলা মৎস্যজীবী দলের আহ্বাযক বিশ্বনাথ সরকার বলেন, আমাদের সংগঠনে কার্ডধারী অনেক মৎস্যজীবি রয়েছে। অথচ আমাদের না জানিয়েই মৎস্যজীবির তালিকা করে গরু বরাদ্দ দেওয়া হলো।
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বকনা বাছুর বিতরণে কোন অনিয়ম হয়নি। অনেক আগে তালিকা করা হয়েছিল। আর সে মোতাবেকই পশু বিতরণ করা হয়েছে। তালিকা করতে সমিতির কেউ টাকা নিয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমার জানা নেই। বিতরণের সময় কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল পরে ঠিক করা হয়েছে। দশটা গরু ছিল পরে সেগুলো ঠিকভাবে বিতরণ করা হয়। সুবিধাভোগীদের তালিকা দিতে তিনি টালবাহানা করেন। বলেন তালিকা ফরিদপুর চলে গেছে। কম্পিউটারেও নেই। পরে দেওয়া হবে বলে জানান। তালিকাভূক্ত সবাই ঠিকভাবে বাছুর পেয়েছে কি না তা যাচাই-বাছাই করবো।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভীর হাসান চৌধুরী জানান, উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে তালিকা করে তা যাচাই-বাছাই করেছেন। আমি শুধু বাছুর বিতরণের উদ্বোধন করি। বিতরণের সময় তালিকায় দশটি নামে অনিয়ম ধরা পড়লে তাদের বরাদ্দ না দিয়ে দশ জন সঠিক ও প্রকৃত ব্যক্তিদের বরাদ্দ দেওয়া হয়।