
বিশেষ প্রতিবেদক, সদরপুর | ৪ এপ্রিল, ২০২৬
অপরাধের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করাই কি তবে কাল হলো? তেল পাচারের মতো অবৈধ কারবারের ভিডিও করায় ফরিদপুরের সদরপুরে সাংবাদিকদের ওপর যে নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা যেন এক সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। এক বা দুবার নয়, অভিযোগ দিতে গিয়ে খোদ থানা চত্বরেই পুলিশের নাকের ডগায় দফায় দফায় রক্তাক্ত হলেন দুই সংবাদকর্মী। সাংবাদিকতার সুরক্ষা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, সদরপুরের এই ঘটনা সেই প্রশ্নটিই বড় করে তুলছে।

অন্ধকারের রাজত্ব ও সাহসের মূল্য
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায়। যখন পুরো গাবতলা এলাকা নিস্তব্ধ, তখন চর বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের জনৈক ডিলার মোহাম্মদ আলী মোল্যা ও তার ছেলে সামী মোল্যা মেতেছিলেন তেলের কারসাজিতে। এই অনিয়মের খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান ‘চ্যানেল এস’-এর সাংবাদিক তোফাজ্জেল হোসেন টিটু এবং ‘দৈনিক ঢাকা প্রতিদিন’-এর আলমগীর হোসেন। কিন্তু ভিডিও করতে গেলেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ডিলারের ক্যাডার বাহিনী। সেটি ছিল প্রথম দফার হামলা।

নিরাপদ আশ্রয় যখন রণক্ষেত্র
সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে থানায় যায় নিরাপত্তার আশায়। শনিবার সকালে এই দুই সাংবাদিকও গিয়েছিলেন সদরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আইন-শৃঙ্খলার রক্ষকদের উপস্থিতিতেই থানা চত্বর হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র। অভিযুক্ত ডিলার ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে থানার ভেতরেই সাংবাদিকদের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও অপরাধীদের দুঃসাহস ছিল আকাশচুম্বী।
এখানেই শেষ নয়; এরপর সাংবাদিকরা যখন নিরাপত্তার দাবিতে থানার সামনের সড়কে অবস্থান নেন, তখন রফিকুল ইসলাম মন্টু ও মোস্তাকি বাবুর নেতৃত্বে তৃতীয় দফায় হামলা চালিয়ে যেন সদর্পে জানান দেওয়া হলো—সদরপুরে মাফিয়াদের কথাই শেষ কথা।

ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ
আক্রান্ত সাংবাদিক তোফাজ্জেল হোসেন টিটু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা শুধু আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে ঘটনাস্থলে এবং দ্বিতীয় দফায় থানায় ঢুকে আমাদের ওপর হামলা করা হলো, তাতে আমরা এখন নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। আমরা কি তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দেব?”

পুলিশের ভাষ্য ও জনমনে প্রশ্ন
সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বিষয়টিকে ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তদন্ত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার কথা বলা হলেও ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও কোনো দৃশ্যমান গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সচেতন মহলে।
একজন ডিলার ও তার সহযোগীরা কতটা প্রভাবশালী হলে থানার ভেতর চড়াও হওয়ার সাহস পায়, এখন সেই হিসেবই কষছে সদরপুরের সাধারণ মানুষ। সাংবাদিকদের কলম থামিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা কি সফল হবে, নাকি প্রশাসন কঠোর হয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে—সেদিকেই তাকিয়ে আছে ফরিদপুরসহ সারা দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা।